মোঃ সোহেল, আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সামরিক উত্তেজনা বর্তমানে এমন এক বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে, যেখানে পরাশক্তিগুলোর আধিপত্যের লড়াইয়ের চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা। হরমুজ প্রণালী ও এর আশেপাশের অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে একদিকে যেমন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি সরাসরি আঘাত হানছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত জল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের মতো অপরিহার্য অবকাঠামোতে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের কার্যকারিতা এবং সাধারণ মানুষের সুরক্ষার বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে এক বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
১. আন্তর্জাতিক আইনে 'বেসামরিক' (Civilian) সাইট বা স্থাপনার আইনি স্বরূপ
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন (International Humanitarian Law - IHL), বিশেষ করে ১৯৪৯ সালের চতুর্থ জেনিভা কনভেনশন এবং তার ১৯৭৭ সালের অতিরিক্ত প্রোটোকল (Additional Protocols I & II) অনুযায়ী সশস্ত্র সংঘাতে বেসামরিক ব্যক্তি ও স্থাপনার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
সংজ্ঞা ও মৌলিক নীতিমালা: আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতি অনুযায়ী, যেসব স্থাপনা সামরিক উদ্দেশ্যের (Military Objectives) সাথে সরাসরি যুক্ত নয় এবং যেগুলোর ধ্বংস বা দখল তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিশ্চিত সামরিক সুবিধা প্রদান করে না, সেগুলোকে নিখাদ 'বেসামরিক স্থাপনা' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
নির্দিষ্ট সুরক্ষাবলয়: জেনিভা কনভেনশনের বিধান অনুযায়ী বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য বস্তুগত ও অবকাঠামোগত উপাদান—যেমন পানীয় জল সরবরাহ ও বিশোধন প্ল্যান্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, খাদ্য শস্য সংরক্ষণের গুদাম, হাসপাতাল, এবং সেতু বা মূল যোগাযোগ ব্যবস্থা—তীব্র সামরিক সংকটেও সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তু করা নিষিদ্ধ।
দ্বৈত ব্যবহার (Dual-Use Facilities): কোনো অবকাঠামো যদি একই সাথে সামরিক এবং বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয় (যেমন কোনো যোগাযোগ টাওয়ার বা সেতু যা সামরিক যাতায়াটেও ব্যবহৃত হতে পারে), তবে আন্তর্জাতিক আইনের নিরিখে সেগুলোর ওপর হামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠোর অনুপাত ও সতর্কতার নীতি (Principle of Proportionality and Precaution) মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক হামলার ভূ-রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক চিত্র
চলমান সংঘাতের জেরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষ থেকেই কৌশলগত এবং বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ উঠেছে, যা জনজীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে:
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিধি:
মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূল এবং হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন এলাকায় বিমান হামলা জোরদার করেছে। এর ফলে ইরানের বিভিন্ন প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন হামলায় হরমুজগান প্রদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযোগকারী বেশ কিছু সেতু ও সড়ক যোগাযোগ, খোজেস্তন প্রদেশের শস্য সংরক্ষণের সাইলো, এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার মতো অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
ইরানের পাল্টা আঘাত ও আঞ্চলিক বিস্তৃতি:
অন্যদিকে, মার্কিন পদক্ষেপের জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রে অবস্থিত মার্কিন মিত্রদেশ ও সামরিক উপস্থিতি সম্পন্ন ভূখণ্ডগুলোতে পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তেহরানের নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাতে কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ পানি বিশোধন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বাহরাইন, জর্ডান এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন ভূখণ্ডে পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক গভীর মানবিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
৩. সংঘাতের মানবিক প্রভাব এবং জনসচেতনতার প্রয়োজনীয়তা
জনজীবন ও মৌলিক সেবার স্থবিরতা:
পরাশক্তিগুলোর এই সামরিক দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বড় মূল্য চুকাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, পানি বিশোধন প্ল্যান্ট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় লাখ লাখ মানুষ বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ ও নিরাপদ আশ্রয়ের মতো মৌলিক মানবিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান:
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে বেসামরিক জনপদে এই ধরনের ধ্বংসাত্মক প্রভাব আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষার্থে অবিলম্বে সংঘাতের তীব্রতা কমানো এবং যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া জরুরি।
উপসংহার
যুদ্ধ বা সংঘাতের তীব্রতা যতই বাড়ুক না কেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মূল দর্শন হলো মানবতাকে অক্ষুণ্ণ রাখা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান সংঘাত যদি বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের এই ধারা বজায় রাখে, তবে তা কেবল দুই দেশের সম্পর্ককেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলোকেও চিরতরে বিপন্ন করবে। বৈশ্বিক শান্তি ও জনসচেতনতার খাতিরে এই সংঘাত থামানো এবং আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।