নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ব্যবসার আড়ালে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার, হুন্ডি কারবার এবং রাষ্ট্রবিরোধী গোয়েন্দা সংস্থার (RAW) সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে দায়ের করা মানি লন্ডারিং মামলায় গ্রেফতার শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরণীদাস ওরফে তৌহিদ ইসলামকে ৪ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিপন হোসেন শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। মামলার প্রেক্ষাপট ও রিমান্ড শুনানি এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর কে এম রাকিবুল হুদা আসামিকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানিকালে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিলের আবেদন জানিয়ে দাবি করেন, মামলায় মানি লন্ডারিংয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট উপাদান নেই। তাদের ভাষ্যমতে, হরিদাস একটি মন্দির পরিচালনা করেন এবং তার ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়া অর্থ ভক্তদের দেওয়া দান। শুনানির সময় বিচারকের অনুমতি নিয়ে হরিদাস চন্দ্র তরণীদাস দাবি করেন, তিনি আগে কৃষিকাজ করতেন এবং বর্তমানে মন্দির পরিচালনা করেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, মন্দির পরিচালনা করাই যদি অপরাধ হয়, তবে তার কিছু করার নেই। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয় এবং আসামিপক্ষ কারাগারের ফটকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তাব দিলেও আদালত ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সিআইডির নথিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য গত রোববার (১২ জুলাই) রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের নিজ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের উপ-পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আসামির ৫টি ব্যাংক ও ৪টি এমএফএস হিসাবে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। এজাহারে আরও বলা হয়, মো. সুজন নামক এক ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে অভিযুক্তের হিসাবে ২ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন, যা হুন্ডির অর্থ বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, কেবল মানি লন্ডারিং নয়, হরিদাস চন্দ্রের বিরুদ্ধে দুই সন্দেহভাজন বিদেশি গোয়েন্দা এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে। অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থে নিজের ও বেনামি নামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। [বিশ্লেষণ: সাংবাদিকের মন্তব্য] ধর্মীয় আবেগ কি অপরাধের ঢাল হতে পারে? হরিদাস চন্দ্র ওরফে তৌহিদ ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো কেবল আর্থিক অনিয়মের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত। একজন ব্যক্তি ব্যবসার আড়ালে কীভাবে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার হুন্ডি কারবার চালিয়ে গেলেন এবং তার সাথে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশের বিষয়টি কতটা গভীর—তা দ্রুত উন্মোচন করা জরুরি। আদালতে আসামিপক্ষের পক্ষ থেকে ‘মন্দির পরিচালনা’ ও ‘ভক্তদের অনুদান’র দোহাই দেওয়া আইন ও ন্যায়বিচারের পথে একটি বড় কৌশলগত ঢাল হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। অতীতেও আমরা দেখেছি, বড় ধরনের আর্থিক অপরাধ বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার পর অনেকে ধর্মীয় বা সামাজিক আবেগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের অপচেষ্টা করেন। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত, এই অনুদানের উৎস এবং অর্থের চূড়ান্ত গন্তব্য কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা। ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার এই অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রতিটি স্তরের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বিশ্লেষণ করলে হয়তো আরও বড় কোনো চক্রের নাম বেরিয়ে আসবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে এ মামলার নিরপেক্ষ এবং গভীর তদন্তই এখন সময়ের দাবি।