নিজস্ব প্রতিবেদক ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার নতুন করে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে এক নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প কোনো পথে তাদের তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারবে কি না। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু বিকল্প অবকাঠামো থাকলেও বর্তমানে হরমুজ প্রণালির পূর্ণাঙ্গ বিকল্প কোনোটিই নয়। জ্বালানি অর্থনীতির ‘চোখ’ হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত এই প্রণালিটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ‘চোক পয়েন্ট’ বা শ্বাসরুদ্ধকর পথ। প্রতিদিন বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজি (LNG) রপ্তানির একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো সংঘাত সরাসরি বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সীমিত বিকল্প ও বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ উপসাগরীয় দেশগুলো গত এক দশকে হরমুজের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে কিছু কৌশলগত বিনিয়োগ করেছে, তবে সেগুলোর সীমাবদ্ধতা ব্যাপক: সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন: এটি লোহিত সাগর উপকূল পর্যন্ত তেল পরিবহনে সক্ষম। বর্তমানে এর দৈনিক সক্ষমতা প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল। এটি একটি শক্তিশালী বিকল্প হলেও উপসাগরীয় অঞ্চলের মোট রপ্তানি চাহিদার তুলনায় তা যৎসামান্য। আবুধাবির হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইন: সংযুক্ত আরব আমিরাত এই পাইপলাইন ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি ওমান সাগরে তেল পাঠাতে পারে। এটি যুদ্ধের পরিস্থিতিতে আমিরাতের জন্য একটি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে, কিন্তু পুরো অঞ্চলের তেল সরানোর সক্ষমতা এর নেই। এলএনজি পরিবহনের ঝুঁকি: কাতারের মতো এলএনজি রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলা কার্যত অসম্ভব। কারণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের জন্য বিশেষায়িত অবকাঠামো প্রয়োজন, যা চাইলেই অন্য কোনো রুটে রাতারাতি স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। বিমা ও পরিবহন ব্যয়ের নেতিবাচক প্রভাব কেবল পাইপলাইনের অভাবই নয়, বরং হরমুজ ঘিরে অস্থিতিশীলতা বিশ্ববাজারে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে দেয়। সংঘাতের আশঙ্কায় জাহাজ মালিকরা তাদের বিমা প্রিমিয়াম (War Risk Premium) বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। এর ফলে তেলের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে পরিবহন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। নিরাপত্তা ও আইনি বাধ্যবাধকতা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ। কোনো একক পক্ষের এটি বন্ধ করার আইনি এখতিয়ার নেই। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের সামরিক অবরোধ বা ট্যাঙ্কার চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামরিক উত্তেজনার চেয়ে কূটনৈতিক পথেই এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। উপসংহার বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে হরমুজ প্রণালির কোনো বিকল্প নেই। পাইপলাইনগুলো কেবল একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে পারে, যা বৈশ্বিক চাহিদার শতভাগ জোগান দিতে অক্ষম। তাই তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক চলাচল সচল রাখা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য কেবল ভূ-রাজনৈতিক নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক অস্তিত্বের লড়াই।